জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা

47হাদীসসমূহের তালিকা

হাদীসসমূহের তালিকা 47

তবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন; তার আমল যাই হোক না কেন।”
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকেও শরীক না করে সাক্ষাত করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় তাঁর সাথে সাক্ষাত করবে যে, সে তাঁর সাথে শরীক স্থির করেছে, তাহলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।”
“যে ব্যক্তি তার দু’চোয়ালের মাঝের বস্তু (জিহ্বা) এবং দু’রানের মাঝখানের বস্তু (লজ্জাস্থান) এর জামানত আমাকে দিবে, আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হবো।”
“জান্নাত তোমাদের জুতার ফিতার চেয়েও বেশি নিকটে আর জাহান্নামও অনুরুপ।”
“জাহান্নাম প্রবৃত্তি দিয়ে বেষ্টিত। আর জান্নাত বেষ্টিত দুঃখ-ক্লেশ ও অপছন্দনীয় জিনিস দিয়ে।”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কোন আমল দ্বারা মানুষ বেশি জান্নাতে প্রবেশ করবে? তিনি বললেন: “আল্লাহর তাকওয়া ও উত্তম চরিত্রের কারণে
“যখন আল্লাহ তা‘আলা জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করলেন, তখন তিনি জিবরীল ‘আলাইহিস সালামকে জান্নাতে প্রেরণ করে বললেন
“কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তখন তার পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাবে। এ সময় সে ঘুরতে থাকবে যেমন গাধা চাকির চারপাশে ঘুরতে থাকে
“এ একটি পাথর যা সত্তর বছর আগে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তারপর তা কেবল নিম্নে পতিত হতে হতে এখন সেটা তার তলদেশে গিয়ে পৌঁছেছে”।
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহ থেকে মারফু‘ সূত্রে বর্ণিত, “নিশ্চয় আল্লাহর পথে মুজাহিদদের জন্য আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতে একশটি মর্যাদার স্তর প্রস্তুত রেখেছেন। দু’টি স্তরের ব্যবধান আসমান ও যমীনের দূরত্বের ন্যায়।”
যে কেউ আল্লাহর পথে জোড়া জোড়া জিনিস ব্যয় করবে তাকে জান্নাতের সব দরজা থেকে ডাকা হবে, হে আল্লাহর বান্দা! এটাই উত্তম। অতএব, যে সালাত আদায়কারী, তাকে সালাতের দরজা থেকে ডাকা হবে। যে মুজাহিদ তাকে জিহাদের দরজা থেকে ডাকা হবে।
“কিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তির সর্বাপেক্ষা লঘু ’আযাব হবে, যার দু’পায়ের তলায় রাখা হবে জ্বলন্ত অঙ্গার, তাতে তার মগয ফুটতে থাকবে”।
আমি কি তোমাদেরকে বলে দিব, কে জাহান্নামের জন্য হারাম অথবা কার জন্য জাহান্নাম হারাম? জাহান্নাম হারাম হলো প্রত্যেক নিকটবর্তী, সহজ-সরল ও কোমল ব্যক্তির জন্য।
জাহান্নামীদের কারো পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত আগুনে স্পর্শ করবে। করো হাটু পর্যন্ত আগুনে স্পর্শ করবে। কারো কোমর পর্যন্ত আবার কারো কণ্ঠ পর্যন্ত আগুন স্পর্শ করবে।
“কিয়ামতের দিন জাহান্নামকে নিয়ে আসা হবে। সেদিন তার সত্তর হাজার লাগাম থাকবে। প্রতিটি লাগামের সাথে থাকবে সত্তর হাজার ফিরিশতা। তারা তা টেনে নিয়ে যাবে।”
পুলসিরাত জাহান্নামের দু’ তীরের মাঝে স্থাপন করা হবে। তাতে থাকবে সাদান বৃক্ষের কাঁটা সদৃশ কাঁটাসমূহ। লোকজন তার উপর দিয়ে অতিক্রম করবে। কতক মুসলিম নিরাপদে তার উপর দিয়ে অতিক্রম করবে, কতক কাঁটার আঁচড় খেয়ে, কতক কাঁটায় বিদ্ধ হয়ে থাকার পর নাজাত পাবে এবং কতক মুখ থুবড়ে জাহান্নামের তলদেশে নিক্ষিপ্ত হবে।
“কোন আহবানকারী জান্নাতী লোকেদেরকে আহ্বান করে বলবে, এখানে সর্বদা তোমরা সুস্থ থাকবে, কখনো অসুস্থ হবে না। তোমরা স্থায়ী জীবন লাভ করবে, কখনো তোমরা মরবে না। তোমরা যুবক থাকবে, কখনো তোমরা বৃদ্ধ হবে না। তোমরা সর্বদা সুখস্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে, কখনো আর তোমরা কষ্ট-ক্লেশে পতিত হবে না
আল্লাহ্ তা‘আলা জান্নাতীদেরকে লক্ষ্য করে বলবেন, হে জান্নাতীগণ! তারা বলবে, হে আমাদের রব! হাযির, আমরা আপনার খেদমতে হাযির। এরপর আল্লাহ্ বলবেন, তোমরা কি খুশি হয়েছ? তারা বলবে, কেন খুশি হব না, আপনি আমাদেরকে এমন বস্তু দান করেছেন যা আপনার সৃষ্টি জগতের আর কাউকেই দান করেননি?
“জান্নাতীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে বলবেন, তোমরা কি চাও, আমি আরো অনুগ্রহ বাড়িয়ে দেই?
“অবশ্যই জান্নাতীগণ তাদের উপরের প্রাসাদের অধিবাসীদের এমনভাবে দেখতে পাবে, যেমন তোমরা আকাশের পূর্ব অথবা পশ্চিম দিগন্তে উজ্জল স্থির তারকা দেখতে পাও। এটি হবে তাদের মর্যাদার ব্যবধানের জন্য।”
“দুই প্রকার জাহান্নামী লোক আমি (এখন পর্যন্ত) প্রত্যক্ষ করি নি (অর্থাৎ, আমার পরে তাদের আবির্ভাব ঘটবে): (১) এমন এক সম্প্রদায় যাদের কাছে গরুর লেজের মতো চাবুক থাকবে, যা দিয়ে তারা জনগণকে প্রহার করবে। (২) এমন এক শ্রেণীর মহিলা, যারা (এমন নগ্ন) পোশাক পরবে যে, (বাস্তবে) উলঙ্গ থাকবে, (পর পুরুষকে) নিজেদের প্রতি আকর্ষণ করবে ও নিজেরাও (পর পুরুষের প্রতি) আকৃষ্ট হবে।
“হে নারী সমাজ! তোমার সদাক্বাহ করতে থাক। কারণ আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক”। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেনঃ কী কারণে, হে আল্লাহ্‌র রাসূল? তিনি বললেনঃ “তোমরা অধিক পরিমানে অভিশাপ দিয়ে থাক আর স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চেয়ে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি”
“সর্বশেষে যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে বের হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তার সম্পর্কে অবশ্যই আমার জানা আছে। এক ব্যক্তি হামাগুড়ি দিয়ে (বা বুকে ভর দিয়ে) চলে জাহান্নাম থেকে বের হবে। তখন আল্লাহ আয্যা অজাল্লাহ বলবেন, ‘যাও জান্নাতে প্রবেশ কর।’ সুতরাং সে জান্নাতের কাছে এলে তার ধারণা হবে যে, জান্নাত পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে সে ফিরে এসে বলবে, ‘হে রব! জান্নাত তো পরিপূর্ণ দেখলাম।’ আল্লাহ আয্যা অজাল্লাহ বলবেন, ‘যাও, জান্নাতে প্রবেশ কর।’ তখন সে জান্নাতের কাছে এলে তার ধারণা হবে যে, জান্নাত তো ভরে গেছে। তাই সে আবার ফিরে এসে বলবে, ‘হে রব! জান্নাত তো ভরতি দেখলাম।’
“মৃত্যুকে সাদা-কালো মিশ্রিত একটি ভেড়ার আকৃতিতে উপস্থিত করা হবে
“তোমাদের কাছে বিদ্যমান আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তরভাগের একভাগ
জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে তর্ক-বির্তক হলো। জাহান্নাম বললো, যতো স্বৈরাচারী যালিম ও অহংকারীরা আমার মধ্যে প্রবেশ করবে। জান্নাত বলল, ফকীর-মিসকীন ও দুর্বল ব্যক্তিরা আমার মধ্যে প্রবেশ করবে।
আমি জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়েছিলাম, তখন আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, যারা তাতে প্রবেশ করেছেন তাদের অধিকাংশই হলো দরিদ্র জনগণ। আর যারা ধনী তারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে আছে।
যদি মুমিন জানত যে, আল্লাহর নিকট কী শাস্তি রয়েছে, তাহলে কেউ তার জান্নাতের আশা করত না। আর যদি কাফের জানত যে, আল্লাহর নিকট কী করুণা রয়েছে, তাহলে কেউ তার জান্নাত থেকে নিরাশ হত না।
কিয়ামতের দিন জাহান্নামীদের মধ্য থেকে এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে, যে দুনিয়াতে সবচেয়ে সুখী ও বিলাসী ছিল। অতঃপর তাকে জাহান্নামে একবার চুবানো হবে, তারপর তাকে বলা হবে, হে আদম সন্তান! তুমি কি কখনো ভালো জিনিস দেখেছ? তোমার নিকটে কি কখনো সুখ-সামগ্রী এসেছে? সে বলবে, না। আল্লাহর কসম! হে রব! আর জান্নাতীদের মধ্য থেকে এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে, যে দুনিয়ার সবচেয়ে দুঃখী ও অভাবী ছিল। তাকে জান্নাতে চুবানোর পর বলা হবে, হে আদম সন্তান! তুমি কি দুনিয়াতে কখনো কষ্ট দেখছ? তোমার ওপর কি কখনো বিপদ গেছে? সে বলবে, না। আল্লাহর কসম! হে আমার রব!
“আমার সামনে জান্নাত ও জাহান্নাম উপস্থিত করা হয়। আজকের মতো ভাল এবং মন্দ আমি আর কখনো দেখিনি। আমি যা জানতে পেরেছি, তা যদি তোমরা জানতে, তবে তোমরা অবশ্যই খুবই কম হাসতে এবং বেশী কাঁদতে
“(শামের) সাইহান ও জাইহান, (ইরাকের) ফুরাত এবং (মিসরের) নীল প্রত্যেকটি নদীই জান্নাতের নদী।
জান্নাত ও জাহান্নাম বিতর্ক করল। জাহান্নাম বলল, আমাকে অহংকারী ও প্রতাপশালীদের দ্বারা প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আর জান্নাত বলল, আমার কি হলো যে, আমার মধ্যে দূর্বল, অবহেলিত ও মূল্যহীন লোক ব্যতীত কেউ প্রবেশ করবে না?
দু’টি জান্নাতের পাত্রসমূহ ও অন্যান্য জিনিস পত্র হবে রূপার তৈরি। আর দু’টি জান্নাতের পাত্রসমূহ ও অন্যান্য জিনিস পত্র হবে সোনার তৈরি। আদন নামক জান্নাতে জান্নাতীগণ ও তাদের মহান প্রভুকে দেখার মাঝে রবের চেহারার উপর বড়ত্বের চাদরের প্রতিবন্ধক ব্যতীত কিছুই থাকবে না।
“জান্নাতের মধ্যে এমন একটি বৃক্ষ আছে, যার ছায়ায় কোনো আরোহী উৎকৃষ্ট, বিশেষভাবে প্রতিপালিত হালকা দেহের দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে একশত বছর চললেও তা অতিক্রম করতে সক্ষম হবে না”।
“জান্নাতে একটি বাজার হবে, যেখানে জান্নাতীগণ প্রত্যেক শুক্রবার আসবে
যে কোনো মুসলিমের তিনটি নাবালক সন্তান মারা যাবে, তাকে আল্লাহ তাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহের বরকতে জান্নাত দিবেন।
কিয়ামতের দিন আল্লাহ প্রত্যেক মুসলিমকে একজন ইয়াহূদী অথবা খ্রিষ্টানকে দিয়ে বলবেন, এই তোমার জাহান্নাম থেকে বাঁচার মুক্তিপণ।
মনে রাখো, আমার রব আমাকে নির্দেশ দেন যে, আমি যেন তোমাদের শিখাই যা তোমরা জানো না। আজকের এই দিনে তিনি আমাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা হচ্ছে: যে সব মাল আমি কোন বান্দাকে দিয়েছি তা হালাল। আমি আমার সব বান্দাদের মুসলিম হিসেবে সৃষ্টি করেছি। শয়তান তাদের কাছে এসে তাদেরকে দীন থেকে বিচ্যুত করেছে এবং আমি তাদের জন্য যা হালাল করি তা সে তাদের জন্য হারাম করে দেয় এবং সে তাদের নির্দেশ দেয় যাতে তারা আমার সাথে শির্ক করে যার ওপর কোন দলীল প্রেরণ করা হয়নি।
“আল্লাহ তা‘আলা যে ব্যক্তিকে তার দুই চোয়ালের মধ্যস্থিত অঙ্গ (জিহ্বা) ও দু’পায়ের মাঝখানের অঙ্গ (লজ্জাস্থান) এর ক্ষতি থেকে মুক্ত রাখবেন, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
জান্নাত ও জাহান্নামের তর্ক হলো। জাহান্নাম বলল, ‘আমার মধ্যে প্রবেশ করবে উদ্ধত ও অহংকারী লোকেরা।’ আর জান্নাত বলল, ‘দুর্বল ও দরিদ্র ব্যক্তিরা আমার ভিতরে প্রবেশ করবে।’ অতঃপর তিনি জাহান্নামকে বলেন, তুমি আমার শাস্তি, তোমার দ্বারা আমি যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিব। আর জান্নাতকে বলেন, “তুমি আমার রহমত, তোমার দ্বারা আমি যার প্রতি ইচ্ছা অনুগ্রহ করব।
“তাঁর শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ আছে, আমি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশী যে, জান্নাতবাসীদের অর্ধেক তোমরাই হবে। এটা এ জন্য যে, শুধুমাত্র মুসলিম প্রাণ ছাড়া অন্য কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আর মুশরিকদের তুলনায় তোমরা এরূপ, যেরূপ কালো বলদের গায়ে (একটি) সাদা লোম অথবা লাল বলদের গায়ে (একটি) কালো লোম।”
জান্নাতীগণ (তাদের উপরস্থ) খাসকামরার লোকগণকে এমনভাবে দেখবে, যেভাবে তোমরা আকাশের তারকা দেখে থাক।
‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে রব বলে, ইসলামকে দ্বীন হিসাবে ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসেবে মেনে নিলো, তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে গেল।’
যা কামনা করেছ তা এবং এর অনুরূপ তোমাকে প্রদান করা হলো।”
“জান্নাতে মুমিনের জন্য ফাঁপা মুক্তার একটি তাঁবু হবে। আকাশে এর দৈর্ঘ হবে ষাট মাইল। তাতে মুমিনের পরিবার-পরিজন থাকবে। মুমিন তাদের চতুষ্পার্শ্বে ঘুরাফেরা করবেন; তাদের কেউ একে অপরকে দেখবে না।”
“মহান আল্লাহ বলেছেন: আমি আমার পুণ্যবান বান্দাদের জন্য এমন জিনিস তৈরি করে রেখেছি, যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কান শুনেনি এবং যার সম্পর্কে কোন মানুষের মনে ধারণাও জন্মেনি।”
“সর্বপ্রথম যে দল জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের মুখমণ্ডল হবে পূর্ণিমার রাতের চন্দ্রের মত উজ্জ্বল। অতঃপর যে দল তাদের অনুগামী হবে তাদের মুখমণ্ডল হবে আকাশের সর্বাধিক দীপ্তিমান উজ্জ্বল তারকার ন্যায়।